‘ডিজেল সংকটে বোরো ধানের জমিতে সেচ দিতে পারছি না। পুরো পরিশ্রম বৃথা যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আমরা দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি।’ গতকাল শনিবার বিকেলে এভাবেই নিজের অভিব্যক্তি তুলে ধরেন মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি উপজেলার ধামারণ গ্রামের কৃষক শামসু মোল্লা।
একই ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন সদর উপজেলার চরাঞ্চলের ধান চাষি মানিক মিয়া। তাঁর ভাষ্য, জ্বালানি তেল না থাকায় সময়মতো জমিতে পানি দিতে পারছেন না। ধানের চারা শুকিয়ে যাচ্ছে। এখন যদি সেচ দিতে না পারেন, তাহলে সব ফসল নষ্ট হয়ে যাবে। অনেকটা হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ফিলিং স্টেশনে গিয়েও তেল পাই না, আবার বাইরে কিনতে গেলে অনেক বেশি দাম দিতে হয়। এত খরচ করে চাষবাদে লাভ তো দূরের কথা, মূলধনই উঠবে না।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষক শামসু মোল্লা ও মানিক মিয়ার মতো জেলার শত শত কৃষকের অসহায় পরিস্থিতি। ডিজেলের অভাবে চলে না সেচযন্ত্র। পানির অভাবে জমি শুকিয়ে মরে যাচ্ছে বোরো ধানের চারা। গুটিকতক কৃষক বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত দাম দিয়ে খোলা বাজার থেকে তেল কিনে পাম্প সচল করে জমিতে পানি দিচ্ছেন।
কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জের ছয়টি উপজেলায় বোরো ধানের জমিতে সেচ দিতে পারছেন না কৃষকরা। তেলের অভাবে সেচ দিতে না পারায় প্রখর রোদে শুকিয়ে যাচ্ছে ধানের চারাগাছ। এই পরিস্থিতিতে কৃষকরা ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে থাকা একাধিক ফিলিং স্টেশনে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মোটরসাইকেল চালকদের চাপে জ্বালানি তেল পাচ্ছেন না।
শ্রীনগর উপজেলার হরপাড়ায় ফিলিং স্টেশনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি তেল পাননি পাঁচলদিয়া গ্রামের কৃষক নান্নু মিয়া। ডিজেল কিনতে না পারায় দুই কানি বোরো ক্ষেতে সেচ দিতে পারছেন না। রোদে জমির ধান গাছ সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কৃষক নান্নু মিয়া বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তেলের জন্য পাম্পে লাইনে ছিলাম। অপেক্ষা করেও তেল পাইনি। শুক্রবার সকাল গিয়া দুপুর হইল, ভাগ্যে জুটল না তেল।’
সদর উপজেলার চুড়াইন গ্রামের কৃষক মোশারফ হোসেন জানান, গত বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবার রাত ১০টা পর্যন্ত তিনি শহরের উপকণ্ঠ মুক্তারপুর এলাকার পূর্ণিমা ফিলিং স্টেশনে গিয়ে এক লিটার ডিজেলও কিনতে পারেননি। চলতি বোরো মৌসুমে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ফসল উৎপাদন নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
সরেজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ বোরো ধানের জমিগুলোর অধিকাংশই সেচের জন্য ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেওয়ায় সেসব সেচযন্ত্র বন্ধ রয়েছে। ফলে সঠিক সময়ে জমিতে সেচ দিতে না পারায় ধানের চারাগুলো প্রখর রোদে শুকিয়ে যাচ্ছে।
লৌহজং উপজেলার গাঁওদিয়া ইউনিয়নের বনসামন্ত গ্রামের প্রবীণ কৃষক লতিফ শেখ জানান, সাকুরা ফিলিং স্টেশনে গিয়ে ডিজেল না পেয়ে ফিরে এসেছেন। বাধ্য হয়ে ১০০ টাকা লিটারের ডিজেল খোলা বাজার থেকে ১৩০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে কৃষি কার্ডের মাধ্যমে জ্বালানি তেল সরবরাহের উদ্যোগ থাকলেও প্রান্তিক কৃষকদের অভিযোগ এই সুবিধা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে তারা আরও বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, মুন্সীগঞ্জে দুই হাজার ২০২টির মধ্যে এক হাজার ৮২১টি নলকূপই ডিজেলচালিত। এর মধ্যে ডিজেলচালিত অগভীর নলকূপ এক হাজার ৮২০টি, ডিজেল চালিত গভীর নলকূপ একটি। বিদ্যুৎচালিত অগভীর নলকূপ ৩৭৩টি, বিদ্যুৎচালিত গভীর নলকূপ সাতটি। চলতি বছর জেলায় ২৪ হাজার ৫২৯ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হাবিবুর রহমান জানান, চলমান তেল সংকটের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যেবক্ষণ করছেন তারা। বোরো মৌসুমে সেচ কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখা জরুরি, কারণ এই সময় পানি সরবরাহে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেও ফসলের উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান: জয়নাল আবেদীন(সজীব) সম্পাদক ও প্রকাশক: নূর আলম ছিদ্দিক (রাজু) যোগাযোগ নাম্বার: 01710087044 নিবাহী সম্পাদক: মোহাম্মদ আলী" যোগাযোগ নাম্বার: 01890525480
ইপেপার