নিজস্ব প্রতিবেদক

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত বৈদ্যপাশা গ্রামে গড়ে উঠেছে বৈদ্যপাশা দারুল আরকাম (রাঃ) শিশু সদন এতিমখানা, হাফিজিয়া ও নূরানী মাদ্রাসা। শিক্ষা ও মানবিক সেবার সমন্বয়ে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটি এতিম, অসহায় ও দুস্থ শিশুদের জন্য শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; বরং তাদের আশ্রয়, পরিচর্যা ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার একটি জায়গা হয়ে উঠছে।মির্জাগঞ্জ উপজেলার ৫ নম্বর কাকড়াবুনিয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বৈদ্যপাশা গ্রামে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটি প্রত্যন্ত জনপদে শিক্ষার পাশাপাশি মানবিকতার যে দৃষ্টান্ত তৈরি করছে, তা স্থানীয় পর্যায়ে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।শুধু মাদ্রাসা নয়, শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার উদ্যোগ বৈদ্যপাশা দারুল আরকাম (রাঃ) শিশু সদনের কার্যক্রমকে কেবল প্রচলিত অর্থে একটি মাদ্রাসার কার্যক্রম হিসেবে দেখলে এর পরিধি অনেকটাই সীমিত হয়ে যায়। কারণ এখানে শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি এতিম ও অসহায় শিশুদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থাও রয়েছে।

একটি শিশুকে শিক্ষিত করে তোলা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার আগে প্রয়োজন তাকে নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া। নিয়মিত খাবার, পোশাক, পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা এবং মানসিক নিরাপত্তা—এসব শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিষ্ঠানটি এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে শিশুদের জন্য পারিবারিক আবহ তৈরির চেষ্টা করছে।এখানে থাকা শিশুদের যেন নিজেদের ভাগ্যকে অভিশাপ মনে না হয়, বরং শিক্ষা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ নির্মাণের সাহস পায়—এই লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার সমন্বয় প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে নূরানী ও হিফজ শাখা। পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে ধর্মীয় জ্ঞান ও জাগতিক শিক্ষার সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।বর্তমান সময়ে একজন শিশুর ভবিষ্যৎ গড়তে শুধু ধর্মীয় কিংবা শুধু সাধারণ শিক্ষা যথেষ্ট নয়—নৈতিকতা, মূল্যবোধ, জ্ঞান, শৃঙ্খলা এবং বাস্তবজীবনের প্রয়োজনীয় শিক্ষার সমন্বয় জরুরি। সেই বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও যুগোপযোগী ও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে।নূরানী শিক্ষা শিশুদের কোরআন শিক্ষার প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করে, আর হিফজ শাখায় তারা পবিত্র কোরআন মুখস্থ করার সুযোগ পায়। এর পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার মাধ্যমে তারা বৃহত্তর জ্ঞানজগতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো শিক্ষার্থী যখন উপজেলা কিংবা জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়, তখন সেটি শুধু একটি ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তার প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, পরিবার এবং এলাকার সম্মান।বৈদ্যপাশা দারুল আরকাম (রাঃ) শিশু সদনের শিক্ষার্থীরাও উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি বাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।এই অংশগ্রহণের তাৎপর্য আরও বেশি, কারণ সুবিধাবঞ্চিত ও এতিম শিশুদের অনেকেরই জীবনের শুরুটা অন্য শিশুদের তুলনায় অনেক কঠিন। প্রতিকূলতার মধ্যেও তাদের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া এবং নিজেদের প্রতিভার পরিচয় দেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়া প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।স্থায়ী পাঁচতলা ভবন—একটি বড় স্বপ্নের বাস্তবায়ন
প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি হলো এতিম শিশুদের জন্য স্থায়ী পাঁচতলা ভবন নির্মাণ। এর নির্মাণকাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।একটি এতিমখানার জন্য স্থায়ী ভবন নির্মাণ নিছক অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়; এটি শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।ভবনটির নির্মাণ সম্পন্ন হলে আরও পরিকল্পিত ও সুন্দর পরিবেশে শিশুদের বসবাস, শিক্ষা ও পরিচর্যার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করার ক্ষেত্রেও এই অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।একটি স্থায়ী ভবনের অর্থ হলো—একটি শিশুর জন্য স্থায়ী আশ্রয়ের নিশ্চয়তা, একটি পরিবারের জন্য স্বস্তি এবং সমাজের জন্য একটি মানবিক দায়িত্ব পালনের নতুন সুযোগ।বৈদ্যপাশা দারুল আরকাম (রাঃ) শিশু সদনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মাওলানা মো. ফারুক হোসাইন। প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক পরিচালনা ও কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম হাবিব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনা, শিশুদের দেখভাল এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য তাঁরা নিজেদের সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করে যাচ্ছেন।একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা যেখানে প্রতিদিনের নানা বাস্তব চ্যালেঞ্জের বিষয়, সেখানে ব্যক্তিগত শ্রম ও অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও শক্তিশালী করতে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা ও সামাজিক অংশগ্রহণও প্রয়োজন।শিশুদের জন্য একটি পরিবারের বিকল্প পরিবেশ এতিম শিশুর জীবনে সবচেয়ে বড় শূন্যতার জায়গাগুলোর একটি হলো পারিবারিক স্নেহ ও নিরাপত্তা। সেই শূন্যতা কোনো প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি পূরণ করতে পারে না। তবে একটি সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও স্নেহপূর্ণ পরিবেশ একটি শিশুকে স্বাভাবিক জীবনের পথে ফিরতে সহায়তা করতে পারে।বৈদ্যপাশা দারুল আরকাম (রাঃ) শিশু সদনে এতিম ও মিসকিন শিশুদের জন্য খাবার, পোশাক ও বসবাসের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ সেই মানবিক জায়গাটিকেই সামনে নিয়ে আসে।শিশুর হাতে যখন বই থাকে, শরীরে পরিষ্কার পোশাক থাকে এবং সামনে থাকে একটি নিরাপদ আশ্রয়—তখন তার কাছে ভবিষ্যৎ আর সম্পূর্ণ অন্ধকার থাকে না। শিক্ষার মাধ্যমে সে নিজের অবস্থান পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখতে পারে।বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বহু পরিবার এখনো অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে বসবাস করে। অনেক শিশুর শিক্ষা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। কারও অভিভাবক নেই, কারও পরিবার সন্তানকে পর্যাপ্তভাবে পড়াশোনা করাতে পারে না।এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্বশীল ও সেবামূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি শিশুকে তার নিজ এলাকার কাছাকাছি রেখে শিক্ষা ও পরিচর্যার সুযোগ দেওয়া গেলে সামাজিকভাবে তার বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি কমে।বৈদ্যপাশার মতো গ্রামীণ জনপদে একটি এতিমখানা ও মাদ্রাসার কার্যক্রম তাই শুধু কয়েকজন শিশুর জীবনকে স্পর্শ করে না; এর প্রভাব বিস্তৃত হতে পারে পুরো এলাকার সামাজিক পরিবেশে।মানবিক উদ্যোগ যতই ভালো হোক, দীর্ঘমেয়াদি সফলতার জন্য প্রয়োজন সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ জনবল এবং সমাজের সহযোগিতা।বিশেষ করে পাঁচতলা ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা, শিশুদের নিয়মিত ভরণ-পোষণ, শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ কার্যক্রম সম্প্রসারণে শুভানুধ্যায়ী ও সমাজের দায়িত্বশীল মানুষের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হলে মানুষের আস্থা আরও বাড়ে। আর মানুষের আস্থা বাড়লে সামাজিক সহযোগিতার পরিধিও বিস্তৃত হয়।আজকের এতিম শিশুই হতে পারে আগামীর সম্পদ।একজন এতিম শিশু আজ হয়তো সমাজের সহায়তা প্রত্যাশী। কিন্তু শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পেলে সেই শিশুই আগামী দিনে শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আলেম, উদ্যোক্তা, সাংবাদিক কিংবা সমাজের অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ পেশার মানুষ হতে পারে।তাই এতিম শিশুদের জন্য ব্যয় করা প্রতিটি শ্রম, সময় ও অর্থকে মানবিক দায়িত্বের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনের বিনিয়োগ হিসেবেও দেখা যায়।বৈদ্যপাশা দারুল আরকাম (রাঃ) শিশু সদনের মূল শক্তি এখানেই—শিশুদের বর্তমানের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার একটি উদ্যোগ এখানে দৃশ্যমান।একটি ভবন উঠছে, সঙ্গে উঠছে অনেক শিশুর স্বপ্ন।বৈদ্যপাশা গ্রামের মাটিতে যখন পাঁচতলা ভবনের নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে, তখন তার সঙ্গে যেন এগিয়ে চলছে অনেক শিশুর ভবিষ্যতের স্বপ্নও।এই ভবন শুধু ইট, বালু, সিমেন্ট আর রডের কাঠামো নয়। এর প্রতিটি অংশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি শিশুর নিরাপদ আশ্রয়, একটি শিক্ষার সুযোগ, একটি পরিবারের উদ্বেগ কমানোর প্রত্যাশা এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের সম্ভাবনা।মাওলানা মো. ফারুক হোসাইন ও সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম হাবিবের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি যে উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে এখন প্রয়োজন পরিকল্পিত সম্প্রসারণ, মানসম্মত শিক্ষা এবং সামাজিক সহযোগিতার সমন্বয়।পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের বৈদ্যপাশার মতো একটি প্রত্যন্ত গ্রামে এতিম ও অসহায় শিশুদের জন্য শিক্ষা, আশ্রয় ও মানবিক সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সামাজিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল সবচেয়ে অসহায় মানুষটির কাছেও পৌঁছে যায়।বৈদ্যপাশা দারুল আরকাম (রাঃ) শিশু সদন সেই পথেই এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে—যেখানে একটি শিশুর পরিচয় তার দারিদ্র্য বা এতিমত্ব দিয়ে নির্ধারিত হবে না; বরং শিক্ষা, নৈতিকতা, মেধা ও যোগ্যতার মাধ্যমে সে নিজের পরিচয় তৈরি করবে।বৈদ্যপাশার এই উদ্যোগ তাই শুধু একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার গল্প নয়; এটি কয়েকটি অসহায় শিশুকে আশ্রয় দিয়ে তাদের চোখে ভবিষ্যতের আলো জ্বালানোর গল্প। পাঁচতলা ভবনটি একদিন পূর্ণতা পেলে সেখানে শুধু একটি স্থাপনা দাঁড়াবে না—দাঁড়াবে বহু শিশুর স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও নতুন জীবনের ভিত্তি।