আগে নিরপেক্ষ তদন্ত, পরে গ্রেপ্তার বা পরোয়ানা’—বিশ্ব সাংবাদিক সমাজের ঐক্যের আহ্বান-২৮/০৯/২০২৬ইং

সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হয়রানি প্রতিরোধ এবং একই সঙ্গে আইনের শাসন ও জবাবদিহি বজায় রাখতে একটি কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ আইনি কাঠামো প্রণয়নের দাবি।

এ লক্ষ্যে বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল সাংবাদিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

প্রস্তাবিত কাঠামোর অন্যতম বিষয় হিসেবে বলা হচ্ছে—কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হলেই যেন কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার বা পরোয়ানার পরিস্থিতি তৈরি না বাস্তবায়ন করা হয়।

অভিযোগের ধরন ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে, আইনসম্মত ক্ষেত্রে প্রাথমিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের সুযোগ আগে রাখতে হবে। তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে সাংবাদিকদের জন্য এমন কোনো ব্যবস্থা কাম্য নয়, যা তাদের আইনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়।

সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অপরাধের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকলে অন্যান্য নাগরিকের মতো তাকেও আইনের আওতায় জবাবদিহি করতে হবে।

একই সঙ্গে সাংবাদিকতার কারণে হয়রানিমূলক মামলা, ভয়ভীতি বা অযাচিত চাপ সৃষ্টি না হয়—সেই সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে আইনের শাসনের সঙ্গে সমন্বয় করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। UNESCO সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য প্রতিরোধ, সুরক্ষা ও বিচার—এই তিনটি দিককে গুরুত্ব দেয় এবং বিভিন্ন দেশে জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর উদাহরণ সংগ্রহ করেছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সাংবাদিকদের আইনি সহায়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। UNESCO-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের  আইনি পরামর্শ, সহায়তা ও প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত সেবার সঙ্গে সংযোগ দেওয়ার জন্য একটি Journalist Support Desk চালু করা হয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৬ সালের আগস্টে UNESCO ও বাংলাদেশ পুলিশ সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের সঠিকতা এবং পুলিশ-মিডিয়া সহযোগিতা নিয়ে ঢাকায় একটি যৌথ কর্মশালা আয়োজন করে। সেখানে নির্বাচন, বিক্ষোভ, জরুরি পরিস্থিতি ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ঘটনায় পুলিশ ও গণমাধ্যমের পেশাগত সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার পেছনে বাস্তব উদ্বেগও রয়েছে। UNESCO সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচার ও দায়মুক্তির বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় কার্যকর তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে।

প্রস্তাবিত আইনি সুরক্ষায় যে বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক সংগঠন, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার সংগঠন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে।

সেখানে—

১. সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হলে আইনসম্মত ক্ষেত্রে প্রাথমিক তদন্তের সুযোগ দিতে হবে।

২. শুধুমাত্র সাংবাদিক পরিচয়ের কারণে কাউকে দায়মুক্তি না দেওয়া;

৩. সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালনের কারণে হয়রানিমূলক মামলা বা চাপ প্রয়োগের অভিযোগ থাকলে তা স্বাধীনভাবে পর্যালোচনার ব্যবস্থা করে দেওয়া।

৪. গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী দ্রুত তদন্ত ও বিচার;

৫. সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি বা সহিংসতার অভিযোগ দ্রুত তদন্তের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা;

৬. সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করণ।

৭. সাংবাদিকদের জন্য সহজলভ্য আইনগত সহায়তা ও জরুরি সুরক্ষা ব্যবস্থা—এসব বিষয় বিবেচনা করা এবং বাস্তবায়ন করা।

এ ধরনের ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা বাড়বে, অন্যদিকে অভিযোগকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ন্যায়বিচারের অধিকারও অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব হবে।

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, তথ্য যাচাই, নৈতিকতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই সাংবাদিক সুরক্ষার যে কোনো নতুন আইন বা নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সাংবাদিকের স্বাধীনতা, নাগরিকের অধিকার, রাষ্ট্রের আইন এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বাধীনতা—সবগুলো বিষয়কে সমান গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে । কে টিভি সাংবাদিক, কে পেপার,কে অনলাইন তা বিষয় নয়, সে সৎ নিরপেক্ষ ঈমানদার সাংবাদিক কিনা সেটাই বিষয় করে সমান দৃষ্টি তে দেখা।

বিশ্ব সাংবাদিক সমাজের প্রতি আহ্বান—সাংবাদিকের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার প্রশ্নে বিভক্ত না হয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা, পেশাগত নৈতিকতা এবং আইনের শাসনের ভিত্তিতে একটি নিরাপদ ও স্বাধীন গণমাধ্যম পরিবেশ গড়ে তুলতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা হোক।

কারণ নিরাপদ সাংবাদিকতা শুধু সাংবাদিকদের অধিকার নয়; এটি জনগণের তথ্য জানার অধিকার, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং একটি কার্যকর গণমাধ্যম ব্যবস্থার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। যে রাষ্ট্রের সাংবাদিক রা যতো সুরক্ষিত সে রাষ্ট্রের মানুষ ততোটাই নিরাপদ, সমাজ ততোটাই অপরাধ মুক্ত বলে আমি মুহাম্মদ রাওফুল বরাত বাঁধন ঢালী মনে করি।