| ১২ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ |৮ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি April 25, 2026, 5:15 pm
Title :
খাদ্য অধিদপ্তরে চলছে কোটি কেটি টাকার বদলি পদোন্নতি ও পোস্টিং বাণিজ্য রাণীনগরে ভটভটি উল্টে নারী শ্রমিক নিহত, আহত ৫ সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সভাপতি জাফর সম্পাদক ইমন ডিজেল সংকটে পরিবহন অচল, কর্মহীন শত শত শ্রমিক! সাড়ে ৩ মাসে রাজনৈতিক সংঘাতে ৪৩ হত্যা আহত পাঁচ হাজারের বেশি! আমতলীতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে বন্ধ সেচ চরম বিপাকে কৃষক! যুবদল মাঠে নামলে জামায়াত-শিবিরের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না: নয়ন যে দুই অঞ্চলে ৮০ কিমি বেগে ঝড়ের শঙ্কা দুই আসিফের আক্রোশের শিকার ক্রিকেট বাকেরগঞ্জে ৯২ কোটি টাকা ব্যয় নবনির্মিত গোমা সেতুতে রাত হলে নেমে আসে অন্ধকার!

সাড়ে ৩ মাসে রাজনৈতিক সংঘাতে ৪৩ হত্যা আহত পাঁচ হাজারের বেশি!

সহ-সম্পাদক ও প্রকাশক খান মেহেদী
  • Update Time : শনিবার, এপ্রিল ২৫, ২০২৬
  • 10 Time View

সারা দেশে রাজনৈতিক বিরোধে সহিংসতা বাড়ছে। এতে বাড়ছে সংঘাত, ঘটছে রক্তপাত। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গত ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত সাড়ে তিন মাসে নিহত হয়েছেন ৪৩ জন। এই সময়ে আহত হন পাঁচ হাজারের বেশি নেতাকর্মী।

রাজনৈতিক বিরোধ, অন্তঃকোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারে সামনের দিনগুলোতে এই হানাহানি আরো বাড়তে পারে বলে রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাঠ পর্যায়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম সিটি কলেজ, পাবনার ঈশ্বরদী কলেজসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা সাধারণ শিক্ষার্থী ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সদস্যদের ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে শতাধিক আহত হন।

ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকেও একই ধরনের পাল্টা অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া গতকাল শুক্রবার সারা দেশে রাজনৈতিক বিরোধে একাধিক সহিংস ঘটনা ঘটে।

ঝিনাইদহের শৈলকুপায় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত বৃহস্পতিবার যুবদলের দুই পক্ষের সংঘর্ষে মোহন সেখ (৬০) নামের এক কৃষক নিহত হন। এ ঘটনায় আরো ১০ জন আহত হন।

এর আগে গত ১৪ মার্চ ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মাধবপুর গ্রামে কৃষকদল নেতা তরু মুন্সি ও ২৬ মার্চ ওই জেলার কুলনাগাছা ভাতুরিয়া গ্রামে আবুল কালাম নামের অন্য এক কৃষক দল নেতা রাজনৈতিক বিরোধের জেরে হত্যার শিকার হন। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে হামলায় আহত এক ছাত্রদল নেতার মৃত্যু ঘিরে এলাকায় সড়ক অবরোধ করে উত্তেজনা ছড়ান স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা।

ঝিনাইদহের মাধবপুর গ্রামে নিহত কৃষক দল নেতা তরু মুন্সির ছেলে মো. নিশান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিজ দলের লোকজনের হাতে রাজনৈতিক সংঘর্ষে বাবাকে হারালাম। এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে? বাবার হত্যাকারীদের বিচার চাই।’

পুলিশ সূত্র বলছে, সম্প্রতি রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা সন্ত্রাসীরা যশোরের মণিরামপুর উপজেলায় রানা প্রতাপ বৈরাগী নামের এক ব্যবসায়ীকে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

বাজার থেকে হেঁটে বাড়ি যাওয়ার পথে চট্টগ্রামের রাউজানে জানে আলম সিকদার নামের সাবেক এক যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক

আধিপত্য বিস্তারের কারণে রাজধানীর পাশাপাশি জেলা শহর, থানা-নগর, বন্দর—এমনকি গ্রামের অপরাধচিত্র খারাপ। বিশেষ করে গুলি করে হত্যার ঘটনা সমাজে বাড়তি আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। অপরাধীরা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকায় পুলিশের বিরুদ্ধে তাঁদের গ্রেপ্তার না করার বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা বরাবরই বলছেন, দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভালো।

তবে রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার পরিবারের সদস্যরা বলছেন, অপরাধ দমন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আরো হুমকির মুখে পড়বে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আশা করা হয়েছিল, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কিন্তু ভালো হওয়ার চেয়ে বরং খারাপ হয়। আগে গ্রেপ্তার না হওয়া অপরাধীদের কারণে সমাজে রাজনৈতিক হানাহানি, সামাজিক বিরোধ, অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। এসব সমস্যার সমাধান না হলে কমানো সম্ভব হবে না।

যদিও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ঊর্ধ্বতনরা বলছেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। তবে এখনো দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সন্তোষজনক উন্নতি হয়নি। এ কারণে জনমনে নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতির সঞ্চার হচ্ছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির এরই মধ্যে বর্তমানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করছে বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন ও সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তিকে আরো শক্তিশালী ও জনবান্ধব করতে।

সাম্প্রতিক ঘটনায় আতঙ্ক : গত বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে দফায় দফায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত আটজন আহত হন। আহতদের মধ্যে ডাকসু নেতাসহ গণমাধ্যমকর্মীরাও রয়েছেন। ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির প্যানেলের সদস্য আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের ফেসবুক আইডি থেকে এআই দিয়ে তৈরি একটি ছবি পোস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুটি রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের মধ্যে বিরোধ-সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে, যার প্রভাব শাহবাগ থানা পর্যন্ত গড়ায়।

এ ঘটনার ছায়া তদন্ত করেছে গোয়েন্দারা। এ বিষয়ে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ঢাবিতে সংঘর্ষের ঘটনায় উভয় গ্রুপের কমবেশি অপরাধ রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার রাতে সংঘর্ষের পর গতকাল সারা দিন ক্যাম্পাসজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে। রাতে ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক লক্ষ করা গেছে। শুক্রবার সারা দিন ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থান টিএসসি, রাজু ভাস্কর্য, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ও আবাসিক হল এলাকার সামনে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে।

এ নিয়ে সামনে ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক আরো বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা ছাত্ররাজনীতির পাশাপাশি সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন জানিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা কখন যে ঘটল আমি বুঝতে পারছি না। এত মানুষ আর সাংবাদিকের ভেতরে কখন, কিভাবে হলো বুঝতে পারছি না।’

গতকাল আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নাটোরের লালপুরে যুবদলের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে পাঁচজন আহত হন। এ সময় মহাসড়ক অবরোধ করে মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়। অবরোধ চলাকালে বিক্ষুব্ধরা নাটোর-পাবনা মহাসড়কে গাছ ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করেন। এতে প্রায় এক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। যাত্রীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।

তিন মাসে বিএনপির নেতাকর্মী বেশি নিহত : মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএসের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ৬১০টি সহিংসতার ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৩৬ জন নেতাকর্মী নিহত হন। এ ছাড়া বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের চার হাজার ৭৮ জনের বেশি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছে।

এ সময় নিহত ৩৬ জনের মধ্যে বিএনপির ২৮ জন (৭৮%), জামায়াতের চারজন (১১%), আওয়ামী লীগের একজন ও অন্যান্য তিনজন রয়েছেন। ৬১০টি সহিংসতার ঘটনার ৫৭৩টিই (৯৪%) ঘটেছে বিএনপির অন্তঃকোন্দলে এবং বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে।

এদিকে গত তিন মাসে বিএনপির অন্তঃকোন্দলে ১৯৪টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত এক হাজার ৫৮৫ জন ও নিহত ২৪ জন। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে ২৬০টি ঘটনায় আহত হয়েছেন এক হাজার ৬৫৪ জন ও নিহত হয়েছেন সাতজন। অন্যদিকে বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে ৩৬টি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছেন ২১৯ জন এবং নিহত হয়েছেন তিনজন। এ ছাড়া বিএনপি-এনসিপির মধ্যে ২৩টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২০৪ জন, আওয়ামী লীগ-এনসিপির মধ্যে তিনটি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত ৫১ জন, বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে ৬০টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৬৯ জন। এ ছাড়া বিভিন্ন দলের মধ্যে ৩৪টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৯৬ জন এবং নিহত হয়েছেন দুজন।

এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ৩৪টি ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় কমপক্ষে ২৯ জন আহত এবং বিএনপির ১২ জন, আওয়ামী লীগের চারজন, জামায়াতের তিনজন ও অন্যান্য দলের তিনজনসহ মোট ২২ জন নিহত হয়েছেন।

পুলিশ যা বলছে : পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথম ১৫ দিনে রাজধানীতে অন্তত ১৬টি হত্যার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে রাজধানীতে ১০৭টি হত্যার ঘটনার ঘটে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৩৬টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩৮টি ও মার্চে ৩৩টি হত্যার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া একই সময়ে সারা দেশে ৮৫৪টি হত্যার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি ও মার্চে খুন হয় ৩১৭টি। এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে গত ১৫ দিনে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে সাতজনকে হত্যার তথ্য পাওয়া যায়।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সমাজে এখন রাজনৈতিক বিরোধ চরম পর্যায়ে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে মানুষকে স্বস্তি দিতে হবে।

সার্বিক বিষয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা, মব সহিংসতা, কারাগার ও হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ—এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যেতে পারে।

এইচআরএসএস বলছে, এই সামগ্রিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক পরিস্থিতির অস্থিরতা আরো তীব্র হয়েছে। সার্বিকভাবে মানবাধিকার পরিস্থিতি, ন্যায়বিচার ও মানুষের সমান অধিকার খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category