
দেশের বিভাগীয় শহরগুলোয় তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুত্হীনতায় পাম্প বন্ধ থাকায় পানির সংকটও তীব্রতর হচ্ছে আবাসিক এলাকায়। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চাহিদার অর্ধেকে নেমে এসেছে।
সেখানে লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার রূপ নিয়েছে। কোথাও কোথাও লোডশেডিং হচ্ছে ১০ ঘণ্টার বেশি। গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে হিমশিম খেতে
হয় বিতরণ সংস্থাগুলোকে। এলাকাভিত্তিক এক ঘণ্টার লোডশেডিংয়ের কথা থাকলেও গড়ে দুই ঘণ্টার বেশি তা করা হচ্ছে সারা দেশে।
চট্টগ্রামে প্রতিদিন গড়ে সাত-আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। রাজশাহীতে লোডশেডিং করতে হচ্ছে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত।
বরিশাল নগরীর রূপাতলির ৩৩ কেভি সাবস্টেশন কন্ট্রোলরুম সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন বরিশাল ও ঝালকাঠিতে বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ৯০ থেকে ৯৫ মেগাওয়াট। সেখানে পাওয়া যাচ্ছে ৪২ মেগাওয়াট।
এ কারণে পিক আওয়ার ও অফ পিক আওয়ারে অন্তত ছয় ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। পিক আওয়ারে কিছুটা বেশি থাকে। ময়মনসিংহ, জামালপুর নেত্রকোনা, শেরপুর, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জ জেলা নিয়ে ময়মনসিংহ জোন। এই জোনের ছয় জেলায় প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে এক হাজার ৭৫ মেগাওয়াট। চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৭৫০ মেগাওয়াট।
দিনে চার-পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং থাকছে। তার দ্বিগুণ লোডশেডিং হচ্ছে গ্রামে।
খুলনার অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চাহিদার অর্ধেকে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, সিলেটে প্রতিদিন চাহিদার বিপরীতে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। রংপুরে এক ঘণ্টা পর পর আবার কখনো দুই ঘণ্টা পর পর লোডশেডিং হচ্ছে।
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রীয় সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য বলছে, গতকাল শুক্রবার দুপুর ১টায় দেশে ১৪ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৪৪৭ মেগাওয়াট। তখন চাহিদা ও সরবরাহে ঘাটতি ছিল ৮৬২ মেগাওয়াট। যদিও গত বৃহস্পতিবার দুপুরে চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি ছিল প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য বলছে, আগামী মাসে বিদ্যুতের চাহিদা উঠতে পারে সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াটে। পর্যাপ্ত জ্বালানির ব্যবস্থা করা না গেলে এই বাড়তি চাহিদার সময় ব্যাপকভাবে লোডশেডিং হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশঙ্কা করছেন।
চট্টগ্রাম থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, তীব্র দাবদাহের মধ্যেই বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে নাকাল বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। জ্বালানির সংকটে চট্টগ্রামের দক্ষিণ জোনের গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহে তৈরি হয়েছে বিশাল ঘাটতি, যা ২৫০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি তেলের অভাব ও গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিট (২, ৩ ও ৫), রাউজান তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিট এবং জুডিয়াক ৫৪ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। বড় কেন্দ্রগুলোর মধ্যে এনলিমা ১১৬ মেগাওয়াট কেন্দ্রেও উৎপাদন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। সকালে ১০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করলেও জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য সন্ধ্যায় তা কমিয়ে মাত্র ১৭ মেগাওয়াটে নামিয়ে আনা হচ্ছে। বাঁশখালীর এস আলম ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কিছু সরবরাহ মিললেও তা চাহিদার তুলনায় নগণ্য।
এ ছাড়া কাপ্তাই সোলার, টেকনাফ সোলার ও উইন্ড প্লান্ট থেকে সামান্য বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। গত ১৬ এপ্রিলের পরিসংখ্যান বলছে, সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪৩২.৭৩ মেগাওয়াট। তার বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ ও স্থানীয় উৎপাদন মিলিয়ে ঘাটতি ছিল ২৮১.৮২ মেগাওয়াট। ঘাটতি মেটাতে লোডশেডিংয়ের আশ্রয় নিতে হচ্ছে পিডিবিকে। চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার, বহদ্দারহাট, আগ্রাবাদ ও হালিশহরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। দিন ও রাত মিলিয়ে সমানতালে চলছে লোডশেডিং। একবার বিদ্যুৎ গেলে ফেরার নাম নেই। নগরীর চকবাজারের গৃহিণী জান্নাতুল মাওয়া আক্ষেপ করে বলেন, ‘একদিকে ভাপসা গরম, অন্যদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। বাচ্চারা গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। সবচেয়ে বড় বিপদ হয়েছে পানি নিয়ে। বিদ্যুৎ না থাকলে পাম্প চলে না, ফলে রান্নাবান্না আর গোসলের পানিও পাওয়া যাচ্ছে না।’
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি জানান, মৌলভীবাজারের সাতটি উপজেলায় শুরু হয়েছে বিদ্যুতের ভেলকিবাজি। গড়ে দিন ও রাত মিলিয়ে আট থেকে ১০ ঘণ্টা থাকছে না বিদ্যুৎ। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে পাঁচ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক। তা ছাড়া রাতে ছাত্র-ছাত্রীরা পড়শোনা করছে টর্চলাইট জ্বালিয়ে। দিনরাত মিলিয়ে প্রতিদিন আট থেকে ১০ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বলছে, ‘সারা জেলায় আমাদের দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ৫০ মেগাওয়াট। গ্রিডলাইন থেকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে সরবরাহ করা হয় ৪৫ শতাংশ।
চাহিদার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে লোডশেডিং বেড়ে গেছে।’ মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী সুজিত কুমার বিশ্বাস বলেন, কয়েক দিন ধরে লোডশেডিং কিছুটা বেড়েছে। কুড়িগ্রাম থেকে আঞ্চলিক প্রতিনিধি জানান, ঘন ঘন বিদ্যুৎবিভ্রাটে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। একই সঙ্গে বোরো মৌসুমের শেষ পর্যায়ে সেচ সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, জেলার সাতটি উপজেলায় প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ গ্রাহকের বিপরীতে বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে প্রায় ৯১ মেগাওয়াট; কিন্তু সরবরাহ করা হচ্ছে ৮০ মেগাওয়াট