
তহশিলদার ও এসিল্যান্ডের এই জঘন্য জালিয়াতির দায় কে নেবে?
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
একটি বিচারাধীন মামলার মূল নথি থেকে স্বয়ং সরকারি কর্মকর্তার সই করা আসল তদন্ত প্রতিবেদন গায়েব! একই স্মারক ও তারিখে সম্পূর্ণ জাল রিপোর্ট নথিতে ঢুকিয়ে দিয়ে ৬ শতাংশ জমির দেওয়ানি মামলায় আস্ত ১১ শতাংশ জমি একটি ভুয়া মাদ্রাসার নামে লিখে দেওয়ার এক অবিশ্বাস্য ও রোমহর্ষক জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে বরিশালের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (ADM) আদালতে। পবিত্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে ঢাল বানিয়ে এই নজিরবিহীন জালিয়াতি ও ভূমিদস্যুতার সিন্ডিকেটের সাথে খোদ আদালতের পেশকার, বাকেরগঞ্জ উপজেলার তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড এবং ইউনিয়ন ভূমি তহশিলদারের সরাসরি জড়িত থাকার অকাট্য প্রমাণ মিলেছে।
দিনদুপুরে সরকারি দফতরে বসে এমন ডাকাতি ও নথি চুরির ঘটনায় বরিশালের সাধারণ মানুষের মনে বিচারব্যবস্থা ও ভূমি প্রশাসনের সততা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ ও দাপ্তরিক নথির সত্যতা
আদালত ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাকেরগঞ্জ উপজেলার ১৩ নং পাদ্রীশিবপুর ইউনিয়নের মৌজা জে এল নং- ২০, রঘুনাথপুর গ্রামে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে বাদী মাজেদা বেগম বিজ্ঞ এডিএম আদালতে সালাম মল্লিক গং-কে বিবাদী করে একটি দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন (মামলা নং- ১২৬৪/২০২৫, বাকেরগঞ্জ, ধারা: ১৪৪/১৪৫ CrPC)। মামলার মূল বিরোধ মাত্র ৬ শতাংশ জমি নিয়ে, যা আরএস ১৯৯৩ দাগের অন্তর্ভুক্ত।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত দাপ্তরিক নথিপত্র অনুযায়ী, বিতর্কিত জমির মূল মালিক ছিলেন বিবাদীদের দাদা। তবে বিবাদীদের বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় উক্ত জমি বিক্রি করে দেন। পরবর্তীতে ২০১১-১২ সালেই নামজারি সৃজিত ১১৩২ নং খতিয়ানের মাধ্যমে বাদীর বিক্রেতার জমি আলাদা করে সম্পূর্ণ বৈধভাবে। সেই ক্রয়সূত্রের ধারাবাহিকতায় বাদী মাজেদা বেগম ২০২২ সালের মূল দলিলমূলে জমিটি কিনে চৌহদ্দি নির্দিষ্ট করে শান্তিপূর্ণ ভোগদখলে যান। যার পশ্চিমে ইউসুফ মল্লিক, উত্তরে ফজলুল হক মল্লিক, দক্ষিণে শামসু মল্লিক এবং পূর্বে খাল বিদ্যমান। এরপর ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে সরকারের রাজস্ব দিয়ে বাদী নিজের নামে ১৭৮১ নং খতিয়ানে চূড়ান্ত নামজারি করান।
মামলাকালীন তড়িঘড়ি দলিল ও ১৮৮ ধারার অপরাধ
বাদীর বৈধ ভোগদখলে বিবাদী পক্ষ বেআইনি বাধা ও দখলের চেষ্টা চালালে, বাদী মাজেদা বেগম নিজের স্বত্ব রক্ষার্থে ২৮/০৭/২০২৬ তারিখে বিজ্ঞ আদালতে এই মামলাটি দায়ের করেন।
বিজ্ঞ আদালতে মামলা দায়ের হওয়ার পর, নিজেদের নিশ্চিত আইনি পরাজয় জেনে এবং বিচারাধীন মামলার আইনকে (Doctrine of Lis Pendens) বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঠিক ১ মাস ৫ দিনের মাথায়—অর্থাৎ ০৩/০৯/২০২৫ ইং তারিখে সম্পূর্ণ অসৎ উদ্দেশ্যে বিবাদী সালাম মল্লিক জমিটির ওপর জালিয়াতির আশ্রয় নেয়। তাদের বাবা জমিটি আগেই বিক্রি করে দেওয়া সত্ত্বেও, বিবাদী পক্ষ সম্পূর্ণ অবৈধভাবে তাদের দাদার পুরনো আরএস রেকর্ড ব্যবহার করে ‘স্বতন্ত্র হোসাইনিয়া ইবতেদায়ী মাদ্রাসা’-র নামে তড়িঘড়ি করে একটি দলিল সম্পাদন করে। উক্ত দলিলে মামলার মূল ৬ শতাংশ জমিসহ তার চাচাতো ভাইয়ের জমিও একসাথে যুক্ত করে মামলা-বহির্ভূত একই দাগের বাকি অংশসহ মোট ১১ শতাংশ জমি মাদ্রাসার নামে লিখে দেওয়া হয়।
এরপর গত ০৩/০৪/২০২৬ ইং তারিখে বিবাদী পক্ষ বহিরাগত মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে লেলিয়ে দিয়ে জোরপূর্বক জমি দখলের চেষ্টা করলে, আদালত অবমাননা ও শান্তিশৃঙ্খলা ভঙ্গের অপরাধে বিবাদীদের বিরুদ্ধে গত ০৯/০৪/২০২৬ ইং তারিখে দণ্ডবিধির ১৮৮ ধারায় আরেকটি ফৌজদারি মামলা করা হয়।
শুনানির দিনে নথিতে ‘ভূত’: আসল রিপোর্ট গায়েব!
তদন্তের আদেশ অনুযায়ী, পাদ্রীশিবপুর ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা সরেজমিন তদন্ত শেষে গত ০৪/০৬/২০২৬ তারিখে একটি আসল তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন, যার দাপ্তরিক স্মারক নং- ইউএলএ/পাদ্রী- ৩০/২০২৬। উক্ত প্রতিবেদনের ৩ নম্বর ও ৭ নম্বর কলামে তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিষ্কারভাবে লিখেছিলেন—“বিরোধীয় ভূমিতে কোনো স্থাপনা বিদ্যমান নাই এবং বিগত ০২ বছর ধরে জমিটি সম্পূর্ণ পতিত (খালি) দেখা যায়।” তৎকালীন সময়ে বাদী পক্ষ এই রিপোর্টের সত্যতা নিশ্চিত করে এসেছিলেন।
কিন্তু গত ১৫/০৭/২০২৬ ইং তারিখে আদালতে মামলার পূর্বনির্ধারিত শুনানির দিন ধার্য থাকলে, বাদী মাজেদা বেগম মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা ও আরেকটি রিপোর্ট দেখে তীব্র ধাক্কা খান। আদালতের নথিতে থাকা তদন্ত প্রতিবেদনটি দেখামাত্রই তিনি স্তম্ভিত ও চমকে ওঠেন! তিনি দেখতে পান, পূর্বে ভূমি অফিস থেকে পাঠানো আসল রিপোর্টটি আদালত কক্ষের মূল নথি থেকে সম্পূর্ণ গায়েব করে দেওয়া হয়েছে।
তার পরিবর্তে হুবহু একই তারিখ (০৪/০৬/২০২৬) এবং একই স্মারক নম্বর (৩০/২০২৬) জাল করে একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও নতুন ভুয়া রিপোর্ট আদালতের নথিতে পুটআপ (সংযুক্ত) করে রাখা হয়েছে। জালিয়াতি করা ওই নতুন রিপোর্টে ৬ শতাংশের মামলার সীমানা ডিঙিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে লিখে দেওয়া হয়েছে—“বিরোধীয় ভূমিতে স্বতন্ত্র হোসাইনিয়া ইবতেদায়ী মাদ্রাসা এর কার্যক্রম পার্শ্ববর্তী একটি ভবনে পরিচালিত হলেও অতি সম্প্রতি ১৯৯৩ দাগে স্থাপনা নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করে।”
রায় হওয়ার আগেই রায় চুরির নীল নকশা!
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক ও চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, এই মামলায় আদালত এখনো কোনো চূড়ান্ত রায় (Judgment) বা আদেশ ঘোষণা করেননি। কিন্তু মামলাটি বিচারাধীন থাকা অবস্থাতেই জালিয়াতি চক্র ব্যাকডোর দিয়ে এই ভুয়া রিপোর্টটি নথিতে ঢুকিয়েছে, যাতে আগামী শুনানির দিনগুলোতে এই বানোয়াট রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে বিবাদী পক্ষ নিজেদের অনুকূলে একটি চূড়ান্ত রায় আনিয়ে নিতে পারে। রায় হওয়ার আগেই পর্দার আড়ালে রায় চুরির এই সুদূরপ্রসারী নীল নকশা ও প্রশাসনের একাংশের পক্ষপাতিত্ব এখন শতভাগ স্পষ্ট।
“আদালতেই যদি ডাকাতি হয়, তবে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?”
হঠাৎ নথিতে এই পরিবর্তন দেখে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মামলার বাদী মাজেদা বেগম এই প্রতিবেদককে বলেন,
“গত ১৫ জুলাই শুনানির দিনে যখন আইনজীবীসহ রিপোর্টটা দেখলাম, আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল! যে রিপোর্ট আমি নিজে দেখে গেলাম জমি খালি রির্পোট সংগ্রহ করি আদালত থেকে , সেটা হঠাৎ করে রাতারাতি মাদ্রাসার সচল ভবন হয়ে গেল কীভাবে? মামলার কোনো রায় এখনো হয় নাই, কিন্তু চোরেরা এই ভুয়া রিপোর্ট দিয়া আমার হকের জমি একবারে গ্রাস করার লাইগা রায় নামানোর পায়তারা করতেছে। দেশের আদালত আর ভূমি অফিস যদি চোর-ডাকাতদের আখড়া হয়, দিনের আলোতে পেশকার আর এসিল্যান্ড মিলে যদি রিপোর্ট গায়েব করে দেয়, তবে এই দেশে সাধারণ মানুষ বাঁচবে কীভাবে? চোরদের খুঁটির জোর কোথায় যে খোদ আদালতের নথি গায়েব করার সাহস পায়? আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভূমিমন্ত্রীর কাছে হাত জোড় করে ভিক্ষা চাইছি—আপনারা এই জালিয়াতি সিন্ডিকেটের হাত থেকে আমাদের বাঁচান। এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করে জেলে পোরা হোক, না হলে দেশের মানুষ আদালতের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে।”
নড়েচড়ে বসছে প্রশাসন: তদন্তের দাবি
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেওয়ানি আইনের অমোঘ নিয়ম হলো—বাবার বিক্রয় দলিলের মুহূর্ত থেকেই ওই সম্পত্তিতে দাদার পুরনো রেকর্ডের সমস্ত আইনি কার্যকারিতা চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। ফলে বিবাদীদের এই দলিলের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। তাছাড়া ৬ শতাংশের মামলায় কীভাবে তদন্ত কর্মকর্তা একই দাগের ১১ শতাংশের মাদ্রাসার অস্তিত্বের ভুয়া রিপোর্ট দিলেন এবং একই স্মারকে দুটি ভিন্ন রিপোর্ট তৈরি হলো, তা সরাসরি নথি চুরি, জালিয়াতি ও প্রতারণার শামিল।
এই রোমহর্ষক জালিয়াতির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় প্রশাসনের ভেতরে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সাধারণ মানুষ ও সুশীল সমাজের দাবি, অবিলম্বে এই চক্রের প্রধান হোতা এডিএম আদালতের পেশকার, তৎকালীন এসিল্যান্ড ও তহশিলদারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সাথে এই জালিয়াতি রিপোর্টের ভিত্তিতে যেন কোনো রায় বা আদেশ না দেওয়া হয় এবং আসল কাগজপত্র পর্যালোচনা করে তলব করে প্রকৃত সত্য বের করা হয়, তার জন্য ভুক্তভোগী পরিবারটি এখন স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ভূমিমন্ত্রী এবং বিভাগীয় কমিশনারের সরাসরি ও জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছে।