
নজরুল ইসলাম আলীম:-ছাত্রলীগের কারাবন্দি নেতা সাদ্দামের স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর ঘটনা কোনো ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের বিচারিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার একটি কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—আমাদের বিচার প্রক্রিয়া এখনো মানবিক বাস্তবতাকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নিতে শিখেনি।বাংলাদেশের বিদ্যমান বিবাহ আইন অনুযায়ী স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর ওপর ন্যস্ত। বাস্তবতা হলো, দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ নারী ও শিশু পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।
এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কোনো বিকল্প সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া স্বামীকে হঠাৎ গ্রেপ্তার করা মানে—পরোক্ষভাবে একটি পরিবারকে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেওয়া।বিশেষত গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে এই বিপর্যয় আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। আয়ের পথ বন্ধ হওয়া, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, চিকিৎসা অনিশ্চয়তা এবং তীব্র মানসিক চাপ—এই সবকিছু একত্রিত হয়ে জীবননাশের ঝুঁকি তৈরি করে। প্রশ্ন হলো, এই ঝুঁকির দায় কি রাষ্ট্র এড়াতে পারে?অপরাধীর শাস্তির ‘Collateral Damage’ হিসেবে যদি নির্দোষ স্ত্রী ও অনাগত সন্তানের জীবন বিপন্ন হয়, তবে সেই বিচার প্রক্রিয়াকে কি নিঃশর্তভাবে ন্যায়সঙ্গত বলা যায়? ন্যায় কি কেবল অভিযুক্ত ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি তার ওপর নির্ভরশীল নির্দোষ মানুষগুলোকেও ন্যায়ের পরিসরে আনতে হবে?জাতিসংঘের ‘ব্যাংকক রুলস’, শিশু অধিকার সনদ (CRC) এবং সিডও (CEDAW) স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে—গর্ভবতী নারী ও শিশু-নির্ভর পরিবারের ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার হওয়া উচিত সর্বশেষ বিকল্প। বহু দেশে তাই নন-কাস্টডিয়াল ব্যবস্থা, বিকল্প নজরদারি বা গৃহবন্দিত্বের মতো মানবিক পদ্ধতি চালু রয়েছে। কারণ উন্নত বিচারব্যবস্থা জানে—ন্যায় মানে কেবল শাস্তি নয়, বরং ক্ষতি কমিয়ে আনা।
ইসলামি ফিকহেও গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে শাস্তি স্থগিত রাখার সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত রয়েছে। যুক্তি একটাই—গর্ভস্থ শিশুর কোনো অপরাধ নেই। সেই নৈতিক যুক্তি যদি ধর্মীয় আইনে গ্রহণযোগ্য হয়, তবে আধুনিক রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থায় তা অগ্রাহ্য থাকার কারণ কী?
গ্রেপ্তারের পর জামিনকে একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখা বাস্তবতাবিবর্জিত। একজন গর্ভবতী নারী বা সদ্য প্রসূতির পক্ষে আইনি লড়াই, অর্থসংগ্রহ ও প্রশাসনিক হয়রানি সামলানো প্রায় অসম্ভব। এই প্রক্রিয়া নিজেই এক ধরনের নীরব নিষ্ঠুরতা।এই মৃত্যু আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—বিচার কেবল আদালতের রায়ে শেষ হয় না। বিচার তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা নির্দোষের জীবন সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হয়।প্রশাসনের কাছে প্রশ্ন—আপনারা কি শুধু গ্রেপ্তার নিশ্চিত করছেন, নাকি সমাজ রক্ষার দায়ও নিচ্ছেন?বিচার ব্যবস্থার কাছে প্রশ্ন—আইনের কঠোরতা কি মানবিক বিবেককে ছাড়িয়ে যেতে পারে?যে বিচার নির্দোষের জীবন রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়,সে বিচার শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে।