
নজরুল ইসলাম আলীম:-জীবন কখনো কখনো হঠাৎ থমকে যায়—একটি মুহূর্ত, একটি দুর্ঘটনা, আর সবকিছু বদলে যায়। গত ৯ ডিসেম্বর রাত ১০টার দিকে বরিশাল যাওয়ার পথে বাকেরগঞ্জ মডেল মসজিদের সামনে ভয়াবহ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় বাম পা হাঁটুর ওপর থেকে ভেঙে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এক সাংবাদিক। মুহূর্তেই স্বপ্ন, সাহস আর ভবিষ্যৎ যেন অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঢেকে যায়।স্থানীয়দের সহায়তায় প্রথমে তাকে বাকেরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের মুখে শোনা যায় ভাঙনের জটিলতা, ঝুঁকি আর সীমাবদ্ধতার কথা। কোথাও আশ্বাসের চেয়ে ভয়ই বেশি—পা কেটে ফেলার আশঙ্কা, কিংবা সারাজীবনের জন্য পা ছোট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।এই কথাগুলো শুধু একজন রোগীর শরীর নয়, তার মনকেও ভেঙে দিয়েছিল।
অন্ধকারের ভেতর আশার আলো ঠিক সেই দুঃসময়ে ভাগ্যের মোড় ঘুরিয়ে দেন অর্থোপেডিক সার্জন ডা. মোঃ ইমরান হোসেন। রোগীর স্বজনদের মাধ্যমে যোগাযোগ হলে তিনি দূর থেকেই এক্স-রে রিপোর্ট দেখে সাহসের কথা শোনান—“ভয় পাবেন না, চিকিৎসা সম্ভব।”তার এই কয়েকটি বাক্যই ভেঙে পড়া একজন মানুষের মনে নতুন করে বাঁচার ইচ্ছা জাগিয়ে তোলে। তিনি বরিশালের ইসলামিয়া স্পেশালাইজড হাসপাতাল-এ ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন এবং নিজ দায়িত্বে চিকিৎসার প্রস্তুতি নেন।চার ঘণ্টার লড়াই, জীবনের জয় ২১ ডিসেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর ২২ ডিসেম্বর অপারেশন থিয়েটারে শুরু হয় চার ঘণ্টার এক নিঃশব্দ লড়াই। অস্ত্রোপচারের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল অনিশ্চয়তা আর প্রার্থনার। অবশেষে লং পিএফএন পদ্ধতিতে সফলভাবে পায়ে স্টিলের রড স্থাপন করে নতুন জীবনের দুয়ার খুলে দেন ডা. ইমরান হোসেন।২৪ ডিসেম্বর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্রের পর শুরু হয় আরেক যুদ্ধ—বেড রেস্ট, ব্যথা, অস্থিরতা আর ধীরে ধীরে সুস্থতার পথচলা। কিন্তু এই পথচলায়ও রোগী একা ছিলেন না।চিকিৎসক নয়, যেন পরিবারের একজন অপারেশনের পরও প্রতিনিয়ত ফোনে খোঁজ নেওয়া, সাহস জোগানো, ছোট ছোট নির্দেশনা দিয়ে পাশে থাকা—সব মিলিয়ে ডা. ইমরান হোসেন যেন হয়ে ওঠেন পরিবারেরই একজন সদস্য। রোগীর আর্থিক দিক বিবেচনায় স্বল্প খরচে চিকিৎসা প্রদান তার মানবিকতার আরেক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।
রোগীর আবেগঘন অনুভূতি—
“দুর্ঘটনার পর মনে হয়েছিল জীবন থেমে গেছে। কিন্তু ইমরান স্যারের কণ্ঠে ভরসার কথা শুনে মনে হয়েছে আমি আবার হাঁটব। তার হাতের চিকিৎসা আর হৃদয়ের মানবিকতা আমাকে নতুন জীবন দিয়েছে।”ধীরে ধীরে ফিরে আসা স্বাভাবিক জীবনে দীর্ঘদিনের কষ্ট, ফিজিওথেরাপি ও নিয়মিত চিকিৎসার পর আজ ধীরে ধীরে হাঁটতে পারছেন তিনি। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন কৃতজ্ঞতার ভাষা—মহান আল্লাহর প্রতি, আর সেই মানবিক চিকিৎসকের প্রতি, যিনি হতাশার অন্ধকারে আশার প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন।
মানবিকতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি
এমবিবিএস (ঢাকা), বিসিএস (স্বাস্থ্য), এফসিপিএস, এমআরসিএস (ইংল্যান্ড) ও এমএস (অর্থোপেডিক কোর্স) ডিগ্রিধারী ডা. ইমরান হোসেন শুধু একজন দক্ষ সার্জন নন; তিনি একজন সহমর্মী মানুষ, যার কাছে চিকিৎসা মানে শুধু অপারেশন নয়—একটি জীবনকে আবার স্বপ্ন দেখার সাহস দেওয়া।
দুর্ঘটনা, ব্যথা আর অনিশ্চয়তার গল্প শেষে তাই রয়ে যায় একটাই অনুভূতি—একজন মানবিক চিকিৎসকের স্পর্শ কখনো কখনো একটি জীবনকে অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরিয়ে আনতে পারে।