
খান মেহেদী :- বাকেরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অব্যাহতভাবে নদীর চর ও ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের নজরদারি ও অভিযান থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে এই অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের নদীর চর, খাস জমি ও উর্বর ফসলি জমি থেকে প্রভাবশালী একাধিক চক্র দীর্ঘদিন ধরে মাটি কেটে ভাসমান পল্টন, ট্রাক ও ট্রলারের মাধ্যমে বিভিন্ন ইটভাটায় সরবরাহ করছে। এতে একদিকে যেমন কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে নদীর তীর ভাঙনের ঝুঁকিও বাড়ছে।
কলসকাঠি ইউনিয়নে ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, রাতের আঁধারে কিংবা ভোরবেলায় মাটি কেটে নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে জমির মালিকদের না জানিয়েই জোরপূর্বক মাটি কেটে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এতে জমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে এবং কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ইটভাটার মালিক স্থানীয় ভূমিদস্যুদের মাধ্যমে নদীর চর, নদীতীরের ফসলি জমি এমনকি ভেরিবাঁধ কেটে মাটি ভাটায় নিয়ে যাচ্ছেন। এতে নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়েছে। কোথাও কোথাও বসতভিটা ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইট পোড়ানোর মৌসুম শুরু থেকেই উপজেলায় বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে শতাধিক ইটভাটা সক্রিয় রয়েছে। ভাটার মালিকরা কখনো ফসলি জমি কিনে, আবার কখনো অবৈধভাবে নদীর চর ও নদীতীরের মাটি সংগ্রহ করে ইট উৎপাদন করছেন। এতে একদিকে যেমন কৃষিজমি ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে কয়েকগুণ।ফরিদপুর ইউনিয়নের কারখানা নদীর চর, নলুয়া ও কলসকাঠী ইউনিয়নের পান্ডব নদীর চরে প্রকাশ্যেই প্রতিদিন মাটি কাটছে ভূমিদস্যুরা। কলসকাঠী ইউনিয়নের বাগদিয়া গ্রামে ভাসমান পল্টন ও ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি কাটার নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাকিব, সাহিন, সহ প্রায় ২৫ জনের একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট।
এ ছাড়া কলসকাঠীর দক্ষিণ সাদিস গ্রাম (আমিনপুর চর) থেকে হাবিব মাওলানার মাদ্রাসা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ খাস সরকারি জমির মাটিও দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে কাটা হচ্ছে। স্থানীয় শামীম শরীফ, ইউপি সদস্য বাদল, আনোয়ার, প্রিন্সসহ একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট প্রতিদিন এখান থেকে মাটি কেটে বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করে আসছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি ট্রলার, ৮ থেকে ১০টি ভাসমান পল্টন ও ভেকু মেশিন দিয়ে কলসকাঠী ইউনিয়নের আমিনপুর পান্ডব নদীর চর থেকে মাটি কেটে অর্ধশতাধিক ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবছর এখান থেকে কোটি কোটি টাকার মাটি অবৈধভাবে বিক্রি করছে চিহ্নিত ভূমিদস্যুরা। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করা হলেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
নলুয়া ইউনিয়নের কৃষক বারেক হাওলাদার বলেন, ভেরি বাঁধ ছাড়া আমাদের জমি টিকবে না। অথচ কিছু লোক রাতের বেলা বাঁধ কেটে মাটি নিয়ে যাচ্ছে। বাধা দিলে আমাদের ভয় দেখানো হয়।
এদিকে কলসকাঠি ইউনিয়নের সেসার্স ওয়ান নীপা ব্রিকসের মালিক মাসুদ হাওলাদার অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট দিন-রাত ভেকু মেশিন ও পল্টন দিয়ে নদীর চর, ভেরিবাঁধ ও মানুষের মালিকানাধীন জমির মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করছে। এতে নদীভাঙন বাড়ছে, বসতভিটা ও ইটভাটাও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনা করা হলেও তা স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, প্রভাবশালী মহলের জড়িত থাকার কারণে অনেক সময় প্রশাসনের উদ্যোগ থমকে যায়।
এ বিষয়ে উপজেলা ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা তন্ময় হালদার জানান, অবৈধভাবে মাটি কাটার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।